Wednesday, April 16, 2008

গল্প : : কে বোঝে মওলার আলেকবাজী

দুনিয়াটা যে একটা মহা ভ্যাজালের জায়গা, আক্কাসের সাথে পরিচয় হওয়ার আগ পর্যন্ত কুদ্দুসের এই বিষয়ে কোন ধারণাই ছিল না। কুদ্দুস নির্ঝঞ্ঝাট ভালো ছেলে। নিয়মিত ক্লাস করে। সন্ধ্যার সময় পড়তে বসে। রাত নয়টায় ভাত খেয়ে টিভি দেখে। দশটার ইংরেজী খবর দেখে। নামাজ পড়ে অনিয়মিত। জুম্মা আর ঈদের নামাজ মিস করে না। শুক্রবারদিন এগারোটার মধ্যে গোসলটোসল সেরে গায়ে একটু আতর দিয়ে মসজিদে গিয়ে বসে। খুতবা কোনদিন শোনে কোনদিন শোনে না। নামাজের পর ভাত খেয়ে কমনরুমে এসে মাঝে মাঝে বাংলা সিনেমা দেখে। প্রিয় নায়ক জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চন আর মান্না, প্রিয় গায়ক কুমার বিশ্বজিত, প্রিয় লেখক আগে ছিল রকিব হাসান এখন হুমায়ুন আহমেদ,ক্যাম্পাসে প্রিয় বন্ধু আক্কাস, প্রিয় বান্ধবী এখনো জোটেনি। হলে এসে অব্দি নেতাদের সমীহ করে চলে, রাজনীতিটাজনীতিতে নেই। বাড়ি বরিশাল। ভাত বেশী খায়।

এরকম একটা ভালো মানুষ সম্পর্কে রূমমেট আক্কাসকে খুব চিন্তিত মনে হয়। পৃথিবীতে এত সমস্যা থাকতে ছেলেটা এত নিশ্চিন্ত এতো নির্লিপ্ত থাকে কিভাবে? সে কি জানে হল এখন মফিজ গ্রুপের দখলে থাকলেও যেকোন দিন মোকলেস গ্রুপ ইন করতে পারে? সে কি জানে যেসব নেতাকে সে সালাম দেয় তারা এই ভালোমানুষির সুযোগে যেকোনদিন কুদ্দুসের রূমে অস্ত্র রেখে যেতে পারে? তাতে কুদ্দুসের ছাত্রজীবন শেষও হয়ে যেতে পারে?না হলেও অন্তত একশো রকম ভ্যাজালে পড়তে পারে? সে কি জানে প্রতিবছর ভর্তি ফি বাড়ানোর পেছনে কোন রাজনীতি কাজ করছে? জানে না। ভাবেও না। সবচাইতে আশ্চর্য ব্যাপার, না ভেবে খুব ভালো আছে ছেলেটা। বিকেল বেলা পাটভাঙা প্যান্টশার্ট পড়ে দিব্যি লেকের ধারে হাওয়া খায়, লাজুক মুখে হাঁটাচলা করে মেয়েদের হলের সামনে। ছেলে জানেও না যে হলের মেয়েরা তাকে ভোদাই মনে করে।

আক্কাস ভাবে, এভাবে তো চলতে পারে না। কিছু একটা করতে হবে। লেনিন বলেছেন, "হোয়াট ইজ টু বি ডান : বার্নিং কোশ্চেন অব আওয়ার টাইম।" সময়ের এইসব প্রশ্ন যাদের পোড়ায় না তার জীবনে কখনো না কখনো কোথাও না কোথাও খোঁড়ায়, কিছু না কিছু খোয়ায়, একথাই বলছিলেন সেদিন কমরেড আলেক মওলা। বহুৎ টানাটানি করে সেদিন কুদ্দুসকে পার্টির সিটিঙে নেয়া গেলো। ও সারাটা সময় মুখ কুমড়ার মতো করে বসে ছিল। ফেরার পথে খুব রাগ হয়ে বলে, "ব্যক্তিগত যৌনপ্রেম ! তোরা এশটাডি সার্কেলের নামে একসের োদার আলাপ করো! মুই নাই এ্যার মইধ্যে।" আক্কাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কুদ্দুস পুরো আলোচনার কিছুই বোঝেনি।

মাস চারেক পরের কথা। সহপাঠিনী সুমিকে ক্ষমতাসীন দলের বখতিয়ার একদিন বাসে সিট রাখা সংক্রান্ত ঝগড়ার একপর্যায়ে একটা নোংরা গালি দিয়ে বসে। সুমি আক্কাসদের কমরেড। সোজা এক চড় বসিয়ে দেয় বখতিয়ারের গালে। বখতিয়ার প্রথমে চুল ধরে পরে ওড়না টান দেয়। কুদ্দুস বরিশাল-পটুয়াখালীর সীমান্ত এলাকার ছেলে। বখতিয়ারকে কলার ধরে বাস থেকে নামিয়ে কমপ্লিট ধোলাই দেয়। বিষয়টা রাজনৈতিক মোড় নেয়। বখতিয়ার আক্কাসদের হলের না। সে মোখলেস গ্রুপের ক্যাডার। রাতে মফিজ ভাই এসে কুদ্দুসের পিঠ চাপড়ে দিয়ে গেলেন, সেই সাথে সিঙ্গেল রুমে ওঠার প্রস্তাব। আক্কাস সাবধান করে দেয় কুদ্দুসকে এগুলি সবই দলে ভিড়িয়ে ক্যাডার বানানোর ফাঁদ। সেদিন রাতে ক্যাম্পাসের রাজনীতি, দেশের রাজনীতি, বিশ্ব রাজনীতি, লৈঙ্গিক বৈষম্য ইত্যাদি বিষয়ে আক্কাস অনেক দীর্ঘ বক্তৃতা দেয়। চিপায় পড়ে যাওয়ায় কুদ্দুস চোখ বড় বড় করে সব গিলতে থাকে। চামের উপর তাকে কমরেড আলেক মওলার গোটা দুই বইও ধরিয়ে দেয় আক্কাস। প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যায় পরদিন। ডিপার্টমেন্টে ঢোকার পথে বখতিয়ার আরো পাঁচ-ছয় জন ক্যাডার নিয়ে কুদ্দুসের উপর চড়াও হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় সিএমএইচ প্রথমে পরে ঢাকায় মামার বাসায় স্থানান্তরিত হয় কুদ্দুস মিয়া। আক্কাসরা বিশাল মিছিল করে। সবাই থ্রেট খায়। কেউ কেউ মারও খায়। মফিজ ভাই পরিষ্কার জানিয়ে দেয় ক্ষমতাসীন দল না করলে কাউকে নিরাপত্তা দেওয়া যাবে না, ইত্যাদি। কমরেড সুমী সেই সিএমএইচ থেকে ঢাকা পর্যন্ত কুদ্দুসের পাশে ঠায় বসে থাকে। পরে ক্যাম্পাসে ফিরে মন খারাপ করে থাকে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয় ইত্যাদি। সুমীর তলব পড়ে কমরেড আলেক মওলার অফিসে। সমমনাদের ব্যক্তিগত প্রেম কিভাবে ব্যষ্টিক থেকে সামষ্টিকে গিয়ে ফজিলত আনতে পারে ইত্যাদি বহু সবক দেওয়া হয়। এই ফজিলতে পৌঁছানোর প্রথম ধাপ হচ্ছে কুদ্দুসকে ম্যাটেরিয়াল আর ইন্টেলেকচুয়াল নার্সিঙের মাধ্যমে লাইনে নিয়ে আসা। কাজ হলো। মাস দেড়েক পরে মাথায় বেরে ক্যাপ পড়ে সুমীর হাত ধরে ক্যাম্পাসে ফেরে কমরেড কুদ্দুস।

হলে ঢুকতেই পোলাপান বিপ্লবী সালাম জানাতে থাকে। মফিজ ভাই জানালেন একটা সাইড যেহেতু ইতোমধ্যেই নিয়ে ফেলেছে তিনি আর ব্যক্তিগত ভাবে কুদ্দুসের ব্যাপারে কিছু করতে পারবেন না। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে নিজেরই ভাবতে হবে। কুদ্দুস সাফ বলে দেয় কে আবার কাকে নিরাপত্তা দেবে.....নিরাপত্তা পেতে নয় লড়াই করতেই তার আগমন ইত্যাদি। আক্কাস ভড়কে যায়। বিরক্তও হয় সামান্য। সুমীকে সেও একটু আধটু ভালো পেতো। সেই ভালো পাওয়া অনতিক্রম্যও ছিলো না। আলেক মওলার জন্য হলো না। ঘরে এসেই কুদ্দুস দরজার উপর সারা বিশ্ব আজ সমাজতন্ত্রের দিকে পোস্টার সাঁটালো। পরদিন সকালে ফরিদ মিয়া ঘর ঝাড়ু দিতে এসে জিজ্ঞাসা করে, এই মাতারি কেডা? নদেঝদা স্ক্রুপস্কায়া, কুদ্দুস গম্ভীর ভাবে বলে। ফরিদ মিয়া ভয়ে আর এদিক আসে না।

যাইহোক। পরের বছর খানেকের মধ্যে কুদ্দুস খুব ডেডিকেটেড কর্মী হয়ে ওঠে। আক্কাসের সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকে। একদিন দুপুরে হলে ফিরে দেখে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। নক করলেও খোলে না। আধাঘন্টা পরে সুমী আর কুদ্দুস বেরিয়ে যায় খুনসুটি করতে করতে। আক্কাস পরের সপ্তাহেই রূম ছাড়ে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠতে থাকে। পার্টির কাজকর্মও আর ভালো লাগে না। অনেক কর্মসূচীই অযৌক্তিক মনে হয়। নেতাদের কাছে কিছু জানতে চাইলেই দেখা যায় আলেক মওলার বই ধরিয়ে দেয়। কারোই কথার সাথে কাজের কোন মিল নেই। একসময় মনে হয় পৃথিবীতে এইসব সমস্যাতো আগেও ছিল। যার গায়ে লাগছে সে লড়ুক। আমার তো খুব সমস্যা হচ্ছে না। মোকাররম মামা তো বলেই রেখেছে শুধু পাসটা করে আসতে পারলেই আপ ডাউন ব্যাঙ্কে চাকরি হয়ে যাবে। কিছুদিন অন্য রূমে থেকে হল ছেড়ে দেয় আক্কাস। বন্ধুর এই মতিভ্রমে কুদ্দুস আহত হয়। কমরেড আলেক মওলা বলে ঢাকায় যাদের বাসা তাদের মানসিক গঠনটাই এরকম ক্যারিয়ারিস্ট ইত্যাদি।

রাজনীতির প্রভাবে ফার্স্ট ক্লাস ফসকে যায় অনার্সে। সুমী অনেক নার্সিং করে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে। মাস্টার্সে এসে ব্যক্তিগত কারণে রাজনীতি ছাড়তে চাইলে সেবছরের কাউন্সিলে যুগ্ম সম্পাদকের পদ ধরিয়ে দেওয়া হয়। মন থেকে না চাইলেও কাজ চালিয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে সুমী হঠাৎ একদিন খুব আহ্লাদ করে বলে সে আইইএলটিএসে সাড়ে সাত পেয়েছে। ইংল্যান্ড না অস্ট্রেলিয়া? সুমী ভেটকি দিয়ে বলে, ইংল্যান্ড। মোকাদ্দেস আঙ্কেল ওখানকার সিটিজেন। তারপর? সুমী বলল, দ্যাখ সবাইকেই যার যার অবস্থান থেকে লড়ে যেতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে লড়াইকেও ধরণ বদলে নিতে হবে। কুদ্দুস ঠান্ডা গলায় জানতে চায় ফ্লাইট কবে? জুলাইয়ের উনিশ। ভালো।

দুদিন পর খবর পেয়ে আক্কাস সিএমএইচে ছুটে আসে। মদ-গাঁজা-ফেনসিডিল একসাথে খেয়ে রক্তবমি করে ভাসিয়ে দিয়েছে। কমরেড আলেক মওলা এলেন একদিন দেখতে। এরকম পেটি বুর্জোয়া ফ্যান্টাসি কিভাবে আত্মঘাতী হতে পারে সেই বিষয়ে বয়ান দিতে শুরু করতেই কুদ্দস দুর্বল গলায় তাঁকে থামতে বলে।

: আমনেরে একটা কথা কমু?

: বলো।

: আমনের গান আমার ধোনে শোনে।

কমরেড মওলা হাসিমুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এখানেও মেইল শভিনিজম! ওকে, আজ চলে যাচ্ছি। তবে আমার কথা যে ঠিক সেটা একদিন বুঝবে।

কুদ্দুস কী একটা খিস্তি করতে যাচ্ছিল, আক্কাস থামিয়ে দিলো।

বছর খানেক পরের কথা।
মাস্টার্সের রেজাল্টে কুদ্দুসের উন্নতি দূরের কথা, আরো দূরবর্তী সেকেন্ড ক্লাস জুটেছে। চাকরির জন্য এখানে সেখানে ঘুরে মামার বাসা থেকে টেকনিক্যাল খোঁটায় বিতাড়িত হয়ে সিদ্দিকবাগ মেসে সাবলেট থেকে কোনরকমে মরতে মরতে একসময় আক্কাসের শরণাপন্ন হলো। চাকরি হলো আপডাউন ব্যাঙ্কে।

কুদ্দুস আর আক্কাসের ডেস্ক এখন পাশাপাশি। কী একটা হিসাব মিলছিলনা একদিন কুদ্দুসের। পরে দু বন্ধু মিলে একটা গোঁজামিল দিয়ে ফাইল ছেড়ে দিলে ম্যানেজার ডেকে দুইজনকেই ঝাড়লেন। মুখ হাঁড়ি করে ডেস্কে ফিরে আক্কাস বিড়বিড় করে বলতে থাকে, মেলে নারে মেলে না কিছুই মেলে না। কিছুক্ষণ পর কুদ্দুস ফিক করে হেসে ফেলে। হাসো ক্যা? কুদ্দুস মাতৃভাষায় বলে, মেলে না তো হৈছে কি? ছেলছে তো বেশী!

2 comments:

Choyon Khairul Go Toygypsy said...

আপনার গল্পগুলো পড়ে ভাল লাগল।ভাষাত খুবই গতিশিল।প্রমিত আর আঞ্চলিকতার যে তর্কের খাতিরে তর্ক শুরু হয়েছে আপনার ভাষা তার লাগসই জবাব হতে পারে।

মানে বেহুদা আঞ্চলিকতাতে না গিয়ে বর্ননার প্রসংগান্তরে গিয়ে আঞ্ছলিকতা ছাড়াই বেশ নাটকিয়তা তৈরি করেছেন।নাটকিয়তার প্রসঙ্গেই বলতে হচ্ছে যে আপনি বর্ননাতে এতই স্বতস্ফুর্ত এবং আন্তরিক যে হয়ত ভুলে যাচ্ছেন যে নাটকিয়তা ব্যপারটি স্বতস্ফুর্ততার বাইরে মগ্ন দাবাড়ুর আয়াস দাবি করে।

কবিতার সাথে কথা সাহিত্যের মৌলিক পার্থক্যই এই যে গল্পের জায়গাটা দাবার চৌষট্টি ঘরের চালে সিমাবধ্ব।কিন্তু সেই সিমানার ভেতরেই যে কত বেশুমার চালের কম্বিনেশন থাকতে পারে!

কবিতায় সেই সিমানাটা নেই।তাই কবিকেই নিজস্ব দাবার বোর্ড বানাতে হয়।না হলে উন্মত্ততা অথবা অনিশ্বেশিত অবসাদ।

আপনার ভেতর ববি ফিশারের আত্মা আছে।বেহুদা বিষয়ে না গিয়ে দেখুন কোথায় সবচেয়ে সাচ্ছন্দ বোধ করছেন।

আর আপনার ভাষা এতই নিজস্ব যে "ফাটাফাটি"র মত শব্দ নিয়ে কুস্তাকুস্তি না করলেও বর্ননা মার খাবে না।বাংলা ভাষার প্রমিত মান নিঃসন্দেহে আপনার প্রয়াস থেকে উপকৃত হবে।

চখাহা
অক্টোবর/২০০৮
লন্ডন

Suman Chowdhury said...

ওরে বাপরে! প্রায় বছর ঘুরে এসে আপনার এই কমেন্ট চোখে পড়লো।

আমি এমনিতে ৫ ফুট ৭। তার উপর এই রকম মন্তব্যে আরো বেঁটে হয়ে যাবো :D

দ্বিতীয় প্যারায় দেওয়া পরামর্শ শিরোধার্য।

জয় জ্যান্ত জ্যান্ত তারামাছ!