Sunday, August 17, 2008

লুৎভিগ ফয়েরবাখ


গত আঠাশে জুলাই দুশ চার বছরে পা দিলেন লুৎভিগ ফয়েরবাখ। মার্কসীয় ধারার বাইরে বস্তুবাদী দর্শনের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের একজন তিনি। শিল্পবিপ্লব পরবর্তী ইউরোপের অস্থির চিন্তাজগতে পারিপার্শ্ব বিশ্লেষণ আর বিশুদ্ধতর নীতিদর্শনের সংঘর্ষ থেকে বস্তুবাদী চিন্তাধারাকে নতুন করে তুলে এনেছিলেন তিনি। ঊনিশ শতকের চল্লিশ দশকের শুরুতে প্রুশিয় চিন্তাজগতকে তাঁর আগমন কতটা মারাত্মক প্রভাবিত করেছিল তা বোঝা যায় ঐ সময়কার নব্য-হেগেলীয় ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের একটি মন্তব্যে, যেখানে তিনি বলেছেন,......খ্রীষ্টধর্মের সারবস্তু এমন এক ঝাঁকি দিলো যে আমরা তরুণ হেগেলপন্থীরা এক লহমায় ফয়েরবাখপন্থী হয়ে গেলাম...

ফয়েরবাখের একটা ট্র্যাজেডি হচ্ছে আধুনিক দর্শনের আলোচনা-সমালোচনায় তাঁর নাম যতটা উল্লেখিত, তিনি দু:খজনকভাবে তার চারভাগের একভাগও (এটা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ) পঠিত নন। তিনি আলোচনায় আসেন মূখ্যত মার্কস-এঙ্গেলসের দার্শনিক নিবন্ধের পাঠ-প্রক্রিয়ায়। এর বাইরে বস্তুবাদের সাধারণ আলোচনায় ফয়েরবাখকে সেভাবে আসতে দেখিনি, যেভাবে চার্বাক, এপিকিউরাস, হবস এমন কি বার্টান্ড রাসেলকে আসতে দেখা যায়। বহু উচ্চমার্গীয় প্যাচাল সমাবেশে ফয়েরবাখ উচ্চারিত হন কার্ল মার্কসের পৌনে দুইপাতার থিসিস অন ফয়েরবাখ এর উল্লেখে। সেই সব আলোচনায় পরিভাষার তুবড়ি ছোটানো অনেকেই বা হয়তো খুব প্রধান একটি অংশই তাঁদের বিশ্লেষণ পর্যালোচনায় ফয়েরবাখকে কোড করেন না বা ফয়েরবাখকে পুন:পাঠের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন না। এর একটা কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের (আগামীকাল ৫ আগস্ট তাঁর প্রয়াণ দিবস) লুৎভিগ ফয়েরবাখ এবং চিরায়ত জার্মান দর্শনের প্রস্থান (আমার ক্ষুদ্র জার্মান ভাষাজ্ঞান বলছে Ausgang শব্দের অর্থ Exit বা প্রস্থান....অবসান মনে হয় না...বিষয়টা নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে বিস্তারিত...এখানে আসলে এঙ্গেলস আলোচ্য নন, আলোচ্য লুৎভিগ ফয়েরবাখ) গ্রন্থে ফয়েরবাখ প্রসঙ্গে তাঁর পূর্বপক্ষ বিবরন। ভারতীয় দর্শনোদ্ভুত একটি রীতি হচ্ছে কোন দার্শনিক মত খন্ডন করতে হলে প্রথমে সেইমতের সারবস্তু উত্থাপন, যাঁকে ভারতীয় দর্শনের পরিভাষায় পূর্বপক্ষ বলা হয়; আর তারপর তাঁর খন্ডন, যাঁকে উত্তরপক্ষ বলা হয়ে থাকে। এঙ্গেলসের উত্থাপিত ফয়েরবাখ বিষয়ক সারাংশে স্বয়ং ফয়েরবাখ কোন আপত্তি করেছিলেন কি না জানা নেই, তবে পরবর্তী রাজনৈতিক আধিপত্যের কারণেই হোক অথবা অন্যকোন গূঢ় অজানা কারণেই হোক গত দেড়শ বছরের দর্শন চর্চায় এঙ্গেলসকৃত ফয়েরবাখের সেই সারাংশের বিরুদ্ধে তেমন কোন আপত্তি ওঠেনি।

আমার ব্যক্তিগত মতে অতীতের রথী-মহারথীরা যতই যাচাইবাছাই করুক, যে কোন জিনিস, দর্শন তো বটেই প্রাসঙ্গীক গুরুত্ব অনুসারে সবসময়েই পরবর্তী পাঠ দাবী করে। আজ যে কারণে শ্রদ্ধেয় সলিমুল্লাহ খান হেগেলের পুর্নপাঠকে জরুরি মনে করছেন, বৃদ্ধসম্মতি নিয়ে আমিও সেই একই গুরুত্বারোপ করতে চাই ফয়েরবাখ প্রসঙ্গে।

লুৎভিগ ফয়েরবাখ এবং চিরায়ত জার্মান দর্শনের প্রস্থান গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায় ফয়েরবাখ এর প্রথম অণুচ্ছেদে, এঙ্গেলস ফয়েরবাখের দর্শনকে বর্ননা করেছেন,

The great basic question of all philosophy, especially of more recent philosophy, is that concerning the relation of thinking and being. From the very early times when men, still completely ignorant of the structure of their own bodies, under the stimulus of dream apparitions (1) came to believe that their thinking and sensation were not activities of their bodies, but of a distinct soul which inhabits the body and leaves it at death — from this time men have been driven to reflect about the relation between this soul and the outside world. If, upon death, it took leave of the body and lived on, there was no occassion to invent yet another distinct death for it. Thus arose the idea of immortality, which at that stage of development appeared not at all as a consolation but as a fate against which it was no use fighting, and often enough, as among the Greeks, as a positive misfortune. The quandry arising from the common universal ignorance of what to do with this soul, once its existence had been accepted, after the death of the body, and not religious desire for consolation, led in a general way to the tedious notion of personal immortality. In an exactly similar manner, the first gods arose through the personification of natural forces. And these gods in the further development of religions assumed more and more extramundane form, until finally by a process of abstraction, I might almost say of distillation, occurring naturally in the course of man’s intellectual development, out of the many more or less limited and mutually limiting gods there arose in the minds of men the idea of the one exclusive God of the monotheistic religions.

কথাটা এঙ্গেলসের নিজের মন্তব্য হলেও যাঁকে ঘিরে এই মন্তব্য, কথাটা প্রবলভাবে আমাকে তাঁর দিকে টেনে ধরে। এই বইটা যখন প্রথম পড়ি তখন স্বদেশে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষের দিকে। ফয়েরবাখ সম্পর্কে মন্তব্য পড়েই মনে হয়েছিল, মার্কস-এঙ্গেলস যাই বলুক এই লোককে পড়তেই হবে। সব না হোক অন্তত তাঁর খ্রীষ্টধর্মের সারবস্তু পড়তেই হবে। কোথায় পাই? জাবির লাইব্রেরীতে পেলাম না। শাহবাগে পেলাম না। ঢাবির লাইব্রেরীতে বন্ধুকে দিয়ে খোঁজ করালাম, সে মুখের ত্রিকোণমিতি বদলে বলে, এইটা দিয়া তুই কী করবি...ইত্যাদি নানান ঝামেলায় শেষে আর পড়া হয় নাই। জার্মানীতে আসা অব্দি থাবা পেতে বসেছিলাম। এইবার পড়তেই হবে। পড়বো তো পড়বো একেবারে মূল জার্মানেই পড়বো। সেই জার্মান শিখবার জন্য কতরকম কুস্তি। এখনো শিখতে পেরেছি কি না জানিনা তবে বইটা দোকানের তাক থেকে আমার টেবিল পর্যন্ত এসেছে কিছুদিন আগে। উল্টে পাল্টে দেখছি...পড়ছিও। পড়ে যা বুঝছি, সেটা ওয়েব লগে টুকে রাখাটাও জরুরি মনে করছি। হয়তো নিতান্তই নিজের জন্য। তাতে কী?

এই মহারথীকে তাঁর ২০৪তম জন্মদিনে ষাষ্টাঙ্গ প্রণাম।

No comments: